নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ধরমন্ডল ইউনিয়ন। জনসংখ্যা ও ভোটারের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। এই গ্রামের বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল। দেশের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন অনেক তরুণ-তরুণী। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক যুবক। রাজনৈতিকভাবেও এই এলাকার পরিচিতি রয়েছে।
তবুও ২০২৬ সালে এসেও ধরমন্ডলের মৌলিক নাগরিক সুবিধার চিত্র যেন অন্য এক বাস্তবতার কথা বলে।
চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ও শিক্ষা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা সংকটের অভিযোগ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একটি জনপদ কেন বছরের পর বছর মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে?
অসুস্থ মেয়েকে কাঁধে করে দেড় কিলোমিটার
সম্প্রতি সকাল ১০টার দিকে বাড়ির নিচে মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাইরে ছুটে যান স্থানীয় এক বাসিন্দা। সেখানে তিনি দেখতে পান হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য।
১৮-১৯ বছর বয়সী এক তরুণী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। মেয়েটির বাবা ও চাচা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত চিকিৎসার জন্য তাকে কোনো যানবাহনে তুলে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
একজন অসুস্থ তরুণীকে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার যুগে এভাবে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি স্থানীয়দের মনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কারণ, স্থানীয়দের অভিযোগ—জরুরি চিকিৎসার জন্য ধরমন্ডলে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নেই। নামে একটি পল্লী ক্লিনিক থাকলেও সেটি নিয়মিত খোলা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ?
চিকিৎসার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এক বাসিন্দার দাবি, তিনি গ্রামে অবস্থান করার সাত দিনে একবারও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক শুক্রবার রাত ১২টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর শনিবার রাত পেরিয়ে রবিবার রাত ১২টার পর বিদ্যুৎ ফিরে আসে।
বিদ্যুতের এমন অনিয়মিত সরবরাহে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রাস্তা আছে, কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
ধরমন্ডলের আরেকটি বড় সমস্যা সড়ক যোগাযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী কিংবা দুর্ঘটনায় আহত কাউকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একটি এলাকার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক যেখানে নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা, সেখানে ধরমন্ডলের বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এত সম্পদ ও সম্ভাবনা, তবুও পরিবর্তন নেই কেন?
ধরমন্ডলে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সংখ্যা কম নয়। দেশের বিভিন্ন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন এই এলাকার অনেক ছেলে-মেয়ে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী যুবক।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদের দিক থেকে ধরমন্ডলের সম্ভাবনা যথেষ্ট।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই এই জনপদ। স্থানীয়দের ভাষায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং প্রভাবশালী অনেক নেতা রয়েছেন ধরমন্ডলে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—
এত শিক্ষিত তরুণ, এত প্রবাসী, এত অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং এত রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকার পরও ধরমন্ডলের চিকিৎসা ব্যবস্থা কেন দুর্বল?
কেন ২০২৬ সালেও একটি অসুস্থ মেয়েকে কাঁধে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হবে?
কেন একটি জনপদে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
কেন রাস্তাঘাট ও শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনো দৃশ্যমান নয়?
দায় কার?
উন্নয়নের জন্য শুধু সরকারি বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের সচেতনতা, জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা।
ধরমন্ডলের মতো সম্ভাবনাময় একটি জনপদে যদি দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক নাগরিক সুবিধার সংকট থাকে, তাহলে এর কারণ ও দায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবারই ভাবা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা—কেউ যেন এই সমস্যাগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা ব্যক্তিগত কৃতিত্বের বিষয় না বানিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের প্রশ্ন হিসেবে দেখেন।
এখন সময় প্রশ্ন করার
একটি অসুস্থ মেয়েকে কাঁধে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কোনো সভ্য ও আধুনিক জনপদের স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না।
বিদ্যুতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, জরুরি চিকিৎসার জন্য দূরে ছুটে যাওয়া, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিক্ষার নানা সীমাবদ্ধতা—এসব সমস্যা কোনো একক পরিবারের নয়; এগুলো একটি পুরো জনপদের সমস্যা।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু “ধরমন্ডলের উন্নয়ন কবে হবে?”—এটা নয়।
প্রশ্ন হলো—
“ধরমন্ডলের উন্নয়ন এতদিন হলো না কেন?”
১৮ হাজারের বেশি ভোটারের এই জনপদ কি তার ন্যায্য নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে না?
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি অনেক হয়েছে। এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পরিবর্তন।